বদরের যুদ্ধ : ইসলাম ও জিহাদ | ফিচার | মুহাম্মদ আজিজুল হক চৌধুরী

0
291

জ থেকে ১৩৯৬ বছর আগে, যে বছর মদিনায় প্রথম সিয়াম তথা মাহে রমজান পালিত হয়, ২য় হিজরি সালের ১৭ই রমজান, মোতাবেক ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ ইসলামের ইতিহাসের প্রথম আত্মরক্ষামূলক সশস্ত্র জিহাদ ‘বদরের যুদ্ধ’ অনুষ্ঠিত হয়।

ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হয়েছিল বলে এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনকেই আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন হক্ব ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নিরুপনকারী দিন বানিয়ে দিয়েছিলেন।

ইসলামের এই সশস্ত্র জিহাদ যা মদীনার উপকন্ঠে বদর নামক পানির স্থানের কাছে সংঘটিত হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে বদর প্রান্তর মদীনা শরীফের নিকটেই অবস্থিত।

এ থেকে বুঝা যায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ মক্কার কাফেরদেরকে ধ্বংস করার জন্য মক্কার উপকন্ঠে যান নাই। বরং মক্কার কাফেররা মদীনা সনদের মাধ্যমে নব্য প্রতিষ্ঠিত মদীনা সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করার জন্য এগিয়ে এসেছিল। তাই বদরের যুদ্ধ ছিল আত্মরক্ষামুলক।

আমাদের প্রিয় নবীজী ﷺ দুনিয়াতে থাকাবস্থায় ইসলামের প্রায় সবকটি বড় বড় যুদ্ধই ছিল আত্মরক্ষামুলক। কাজেই ইসলাম আক্রমনাত্মক ধর্ম নয়, যুদ্ধবাজ ধর্ম নয় এবং ইসলাম কাউকে ধ্বংস করার জন্য উদ্যত হয় না। কিন্তু যদি কোন বহিরাগত শত্রু আক্রমণ করে তবে ইসলাম কাপুরুষের ধর্মও নয় বরং ধৈর্য্যের মাধ্যমে সাহসিকতার সাথে আত্মরক্ষামূলক লড়ে যাওয়ার ধর্ম আমাদের ইসলাম।

বদর যুদ্ধে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য প্রত্যক্ষ সাহায্য নাজিল হয়েছিল। যেমনটা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছেঃ
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنتُمْ أَذِلَّةٌ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
বস্তুতঃ আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো। {সুরা আলে ইমরান – ১২৩}

এই যুদ্ধে রাসুলে পাক ﷺএঁর অনেক মুজিযাও প্রকাশ পায়। যেমনটা আল্লাহ পাক সুরা আনফালের ১৭ নং আয়াতে বর্ননা করেছেন,
وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ رَمَىٰ
“…আর আপনি মাটির মুষ্ঠি নিক্ষেপ করেননি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলেন, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং …”

নবী করীম ﷺ কে জিবরাইলল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি এক মুষ্ঠি মাটি নিয়ে কাফিরদের প্রতি নিক্ষেপ করুন। নবী করীম ﷺ তাই করলেন।
তাফসীরে ইবনে কাসীরের মধ্যে এসেছে হজরত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম) থেকে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাছ (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা) উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে বর্ননা করেছেন যে, এই ধুলা সকল কাফিরদের চোখে মুখে প্রবেশ করল এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হলো।

এই যুদ্ধ আমাদের জন্য বিশাল শিক্ষা। অল্প সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম যারা সংখ্যায় ছিলেন ৬০ জন মুহাজির ও ২৫৩ জন আনসার সহ মোট ৩১৩ জন মাত্র, তাঁদের অস্ত্র ছিল ৩টি ঘোড়া, ৭০ টি উট, ৬টি বর্ম ও ৮টি তালোয়ার যা কাফেরদের অস্ত্রের তুলনায় খুবই অল্প। অপরদিকে মক্কার কাফিরদের সংখ্যা ছিল ১০০০ এবং তাদের অস্ত্র, ঘোড়া ও সাজ সরন্জামও ছিল বিস্তর।

কিন্তু সাহাবায়ে কেরামগন ছিলেন তাকওয়া (আল্লাহর ভীতি)’র বলে বলীয়ান এবং আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসুল করীম ﷺএঁর প্রতি বিশ্বাস ছিল অটুট। আল্লাহর সাহায্যের উপর তাঁদের অগাধ আস্থা ছিল। সবচাইতে বড় কথা তাঁরা জিহাদ করেছিলেন আল্লাহর কালিমাকে সর্বোচ্চে তুলে ধরার জন্য, আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কারো ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য জিহাদ করেন নাই, শক্তিপ্রদর্শন ও শৌর্যবীর্য প্রকাশের জন্যও যুদ্ধ করেন নাই। ইহুদী নাসারাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তাদের হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হন নাই, যেমনটা আজকের কিছু নামধারী জিহাদীরা হচ্ছে। তাঁরা রক্তপিপাসু মানসিক বিকারগ্রস্থও ছিলেন না , যেমনটা আজকালকার নামধারী জিহাদীরা হয়ে থাকে। এককথায় তাঁদের একনিষ্ঠা ছিল এবং এজন্যই আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন তাঁদেরকে বিজয়ী করেছেন।

মোটকথা বদরের যুদ্ধই আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে, আমরা যদি একনিষ্ঠা সহকারে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকি , তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্য অবশ্যম্ভাবী। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। যে শিক্ষার প্রত্যক্ষ প্রভাব আমরা হজরত সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর (রাহিমাহুল্লাহ) মসজিদুল আকসা অর্থ্যাৎ ফিলিস্তিন বিজয়ের মধ্যে দেখতে পাই। যেখানে ইউরোপের বিশাল যৌথবাহিনীকে তাঁর দল পর্যোদস্ত করতে পেরেছিল। উসমানী খলিফা মোহাম্মদ আল ফাতিহের কন্সটান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুল বিজয়ের মধ্যে দেখতে পাই, যেখানে ইস্টার্ন রোম সাম্রাজ্যের প্রবল পরাক্রমশালী সিজার পরাজিত হয়েছিল। আবার হজরত খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি) এঁর আশীর্বাদপুষ্ঠ মোহাম্মদ ঘুরীর মাঝে ছিল বদরী শিক্ষা। যেই কারনে গুটিকয়েক সৈন্য নিয়ে তাঁরা অত্যাচারী রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন। হজরত শাহজালাল মোজাররদ ইয়ামেনীর(রাহমাতুল্লাহি তাআলা আলাইহি) আশির্বাদপুষ্ঠ হজরত সৈয়দ নাসিরুদ্দীন সিপাহসালার ও সিকান্দর খান গাজীর (রাহীমাহুমুল্লাহ) সিলেট ও হবিগন্জ বিজয়ের মধ্যে ছিল বদরের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব। যেখানে অত্যাচারী রাজা গৌড় গোবিন্দ পরাজিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে যখন ফ্রান্সের রাজা নবম লুইস মিশর আক্রমন করে তখন হজরত ইমাম আবুল হাসান আশ শাজেলী (রাহিমাহুল্লাহ, যিনি শাজেলীয়াহ তরীকার ইমাম ছিলেন) এবং তাঁর শিষ্য ইমাম ইজ্জুদ্দিন ইবনে আব্দুস সালাম (রাহিমাহুল্লাহ) দের মাঝে দেখা গিয়েছিল বদরী শক্তির প্রভাব। যারা নবম লুইসকে পরাজিত করে মিশরের মনসুরা শহরে বন্দি করে রেখেছিলেন। আলজেরিয়ার মর্দে মুজাহিদ শায়খ হজরত আব্দুল কাদীর আল জাযায়েরীর (রাহীমাহুল্লাহ) মাঝে ছিল সঠিক বদরী শিক্ষা , যিনি ফ্রান্সের প্রবল পরাক্রমশালী শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে পাকভারত বাংলাদেশের ওলী আউলিয়া পীর মাশায়েখগন এবং হক্বপন্থি আলিম উলামাগন ছিলেন বদরী শক্তিতে বলীয়ান।

মনে রাখা দরকার, ইসলামে যেমনিভাবে জিহাদের গুরুত্ব রয়েছে; তেমনি রয়েছে জিহাদের নির্দিষ্ট বিধিবিধানও। বিধিবিধান বলতে, জিহাদ কখন কার উপর ফরয হয় এই জাতীয়। হুট করে কেউ একজন ‘হাইয়্যা আলাল জিহাদ’ (জিহাদের দিকে আসো) বলে ডাক দিলেই জিহাদ ফরয হয় না। জিহাদ ফরয হয়, শরয়ী কতিপয় নিয়ম-নীতির আলোকে।

বরং কখনো কখনো ওসব নিয়ম-নীতি না জেনে, জিহাদের নাম ভাঙিয়ে ডাক দেয়ার ফলে জাতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বসবাসরত সাধারণ মানুষ খুবই নিরাপত্তাহীনতায়ভোগে। দেশ-জাতি হুমকির সম্মুখিন হয়। আল্লাহ তা’য়ালা এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে আমাদের হিফাযত করুন! (আমিন!)

বিশেষ করে আমাদের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জিহাদের মাসআলা বা জিহাদ ফরয হওয়ার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ঊনিশ থেকে বিশ হলেই দেশের জন্য ক্ষতি; দেশের মানুষের জন্য ক্ষতি।

এমনকি সামান্য ভুলের কারনে গোটা ইসলাম প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে; বিধর্মীরা জিহাদকে তুলনা করতে পারে নারকীয় সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের সাথে। যা বর্তমান বিশ্বে অহরহ করছেও বটে। যার ফলে আ-ম মুসলমান নিরাপদ বসবাসের জায়গা দিন দিন সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

জিহাদ বললেই সন্ত্রাস আখ্যা দিচ্ছে। জঙ্গী বলে ভূষিত করছে। ফলে সন্ত্রাস বা জঙ্গী তালিকভুক্ত হওয়ার ভয়ে জিহাদের চর্চা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। চর্চা না থাকার কারনে জিহাদ বললে নিজেরাও ভয়ে থমকে যাচ্ছি। অথচ জিহাদ আর জঙ্গীবাদ কখনো এক নই। বরং জিহাদের মতো ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ন অধ্যায়কে জঙ্গী বা সন্ত্রাসবাদের সাথে তুলনা করা চরম বেয়াদবি ও সুস্পষ্ট অন্যায়।

জিহাদকে সন্ত্রাস বা জঙ্গীবাদের সাথে তুলনা করা যেমন অন্যায়; জিহাদ ফরয না হয়ে জিহাদ জিহাদ বলে চিৎকার করে সাধারণ মানুষকে কষ্টে পতিত করাও অন্যায়। একদম ভয়ঙ্কর অন্যায়।

জিহাদ, দুনিয়াবি কারনে কারো প্রতি চড়াও হয়ে ঝাপিয়ে পড়ার নাম নই। অথবা কোনো নিরহ সম্প্রদায় বা ব্যক্তি বিশেষের প্রতি বল প্রয়োগের নামও নই। বলতে পারেন, জিহাদ মানে আত্নরক্ষা বা প্রতিরোধ। অর্থাৎ নিজেকে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সামলানো।

আল্লাহ-রাসূল (ﷺ) কুর’আন-কালিমা ইত্যাদি দ্বীনের সব কিছুই নিজ বা আত্ন হিসেবে বিবেচিত। তাই এসবের প্রতি সরাসরি কারো অবমাননা অথবা হস্তক্ষেপ ঠেকানোর নামই, জিহাদ। দুনিয়া কামাইয়ের জন্য কোনো বিধর্মীর প্রতি অত্যাচার করা, নিরহ বলে কারো প্রতি যুলুম করা জিহাদ নই; জঙ্গিবাদ।

আসুন! সন্ত্রাস কিংবা জঙ্গিবাদকে না বলি।

সহকারি শিক্ষক, আহলা জয়কালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here