আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী শেফালী ঘোষের ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

0
245

নিজস্ব প্রতিবেদক :
শেফালী ঘোষ, আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী হিসেবেই যার পরিচিতি। মূলত বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের শিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম কণ্ঠসৈনিক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করেন এই কিংবদন্তী।

আজ তার মৃত্যু বার্ষিকী। প্রয়াত এই গুণীশিল্পীর প্রতি চ্যানেল বোয়ালখালীর বিনম্র শ্রদ্ধা।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার কানুনগোপাড়া গ্রামে ১৯৪১ সালের ১১ জানুয়ারি জন্ম নেন  শিল্পী শেফালী ঘোষ। পিতা কৃষ্ণ গোপাল ঘোষ ও মাতা আশালতা ঘোষ। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শেফালী ঘোষ পড়াশোনা করেছেন কানুনগো পাড়া মুক্তাকেশী উচ্চবিদ্যালয়ে। গ্রামে বাবা ও পরে স্কুল শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় তাঁর সংগীত জগতে আসা। তাদের এই অনুপ্রেরণায় বুকে আঁকড়ে ধরে ১২ বছর বয়সে ওস্তাদ তেজেন সেনের হাতেই শেফালী’র সংগীত জীবনের হাতেখড়ি নেন। ১৯ বছর বয়সে গানের টানে ছুটে যান চট্টগ্রাম শহরে। শিল্পী হওয়ার পেছনে শেফালী ঘোষকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন সংগীতজ্ঞ ননীগোপাল। পরে ননীগোপাল সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শেফালী ঘোষের। পরবর্তীতে ওস্তাদ শিবশঙ্কর মিত্র, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়া, মিহির নদী, গোপালকৃষ্ণ চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংগীতজ্ঞের কাছে তিনি দীক্ষাগ্রহণ করেন।

আঞ্চলিক গানের দুইশটি জনপ্রিয় এ্যালবাম বের করার কৃতিত্বের অধিকারী এই কিংবদন্তী। প্রায় পাঁচ দশকের সংগীত জীবনে তিনি গেয়েছেন প্রায় সহস্রাধিক গান। ১৯৬৩ সালে প্রথমে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত এবং আধুনিক গান মাধ্যমে শুরু হয় শিল্পীজীবন, যখন শেফালী ঘোষের বয়স ছিল ২২ বছর। চট্টগ্রাম বেতারের তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক আশরাফুজ্জামান শেফালী ঘোষ এবং আঞ্চলিক গানের সম্রাট শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবকে আঞ্চলিক ভাষায় গান গাইতে প্রস্তাব জানালেন। এতে দুইজনই রাজি হলেন, এবং তাদের সেই দ্বৈত কণ্ঠের গানটি মলয় ঘোষ দস্তিদারের লেখা

নাইয়র গেলে বাপর বাড়ি আইস্য তাড়াতাড়ি,
তোঁয়ারে ছাড়া খাইল্যা ঘরত থাইক্যুম কেন গরি?
বেশীদিন থ্যাকত্তম ন নাইয়র আইস্যুম তাড়াতাড়ি
পরাণ পুড়ের মা বাপললাই ন যাই নপারি।

(বাপের বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছ, ফিরে এসো তাড়াতাড়ি, তোমাকে ছাড়া একা ঘরে কেমন করে থাকব?

বেশী দিন থাকবো না বাপের বাড়ি আসবো তাড়াতাড়ি,
পরাণ জ্বলের মা বাপললাই না গিয়ে পারি না)
গানটি গাওয়ার পর ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। তখন থেকে বাংলা সঙ্গীতের আকাশে আঞ্চলিক গানের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েই রইলেন শেফালী ঘোষ।

এছাড়াও ১৯৬৪ সালে সর্বপ্রথম রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম কেন্দ্রে নজরুল সঙ্গীতে তার নাম তালিকাভুক্ত হয়। তার প্রথম সঙ্গীত পরিবেশিত হয় ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’। ১৯৭০ সালে সর্ব প্রথম টেলিভিশনে তার গান সম্প্রচার করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন করেন। বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে গান গেয়ে অনুপ্রাণিত করেন।

১৯৭৪ সালে শেফালী ঘোষ প্রথম চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। ১৯৭৮ সালে লন্ডনের প্রখ্যাত মিলফা লিমিটেড তার গানের ১০টি ক্যাসেট এবং লং প্লে বের করে। ১৯৭৯ সালে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী রয়েল আলবার্ট হলে সংগীত পরিবেশন করেন। ঢাকা রামপুরা টেলিভিশনে কেন্দ্র উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি গান গেয়ে ভূয়সী প্রশংসা পান। বসুন্ধরা, মধুমিতা, সাম্পানওয়ালা, মালকাবানু, মাটির মানুষ, স্বামী, মনের মানুষ, বর্গী এল দেশে প্রভৃতি চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন তিনি।

তার গান এবং সুখ্যাতি তখন দেশের মাটি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে ছড়িয়ে আছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় ২০টিরও বেশি দেশে সঙ্গীতের ফেরিওয়ালা হয়েছে ঘুরে বেড়িয়েছে শেফালী ঘোষ। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছেন যা উপমহাদেশের সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলে মানুষের হাহাকার। ঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞের পর তখনো হতবিহ্বল মানুষ ও প্রকৃতি। ঠিক সেই সময় তিনি গাইলেন এক অসাধারণ গান।

গর্কি, তুয়ান, বইন্যা, খরা, মহামারি, ঘূর্ণিঝড়
ভাসাই মারে, ধ্বংস গড়ে
মাইনস্যে তো আর বই ন রয়
অক্কল হামর ধান্দা চলের,
আবার নতুন সৃষ্টি হর।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের জন্য ‘রাণী’ উপাধিও পেয়েছেন তিনি। এছাড়াও জীবদ্দশায় স্বাধীন বাংলা ১৯৯০ সালে বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক পদক, ২০০২ সালে বাংলা একাডেমি আজীবন সম্মাননা পদক ও ২০০৩ সালে শিল্পকলা একাডেমী পদক লাভ করেন। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে মরণোত্তর একুশে পদক ভূষিত হন তিনি।

আঞ্চলিক গানের এই গুণীশিল্পী শেফালী ঘোষ অনেক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বহুদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন ভারতের অ্যাপোলা হাসপাতালে। ২০০৬ সালে ৩১ ডিসেম্বর আঞ্চলিক গানের রাণী খ্যাত এই গুণী শিল্পী সবার মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এ শিল্পীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে তার জন্ম ভিটা কানুনগোপাড়ায় সমাহিত করা হয়। ২০০৮ সালে ১৯ জানুয়ারি শিল্পী শেফালী ঘোষের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তখনকার বোয়ালখালীর সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার রবীন্দ্রশ্রী বড়ূয়ার উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে শিল্পী ভাস্কর্য। কিন্তু বর্তমানে সংস্কারের অভাবে ভেঙ্গে যাওয়ার পথে এ ভাস্কর্যটি। উপজেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে অবগত করলেও তার দিকে নজর নেই বলেন শিল্পীর জ্যেষ্ঠ ভাই হৃষি কেশ ঘোষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here